চলতি বছরের জন্য বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। কিন্তু গত অক্টোবরে দেয়া ওই পূর্বাভাস সংশোধন করে বড়সড় বাণিজ্যিক পতনের আভাস দিল সংস্থাটি। গত বুধবার ডব্লিউটিও জানায়, ২০২৪ সালের তুলনায় দশমিক ২ শতাংশ বাণিজ্য সংকোচনের দিকে যাচ্ছে বিশ্ব। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাবজনিত কারণে বিশ্ববাণিজ্যে কভিড পরবর্তী সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সংকোচনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খবর রয়টার্স ও আনাদোলু।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্কের হার এরই মধ্যে দফায় দফায় পরিবর্তন হয়েছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চীনও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। ডব্লিউটিও বলেছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য সংকোচনের নতুন এ পূর্বাভাস সপ্তাহের শুরুতে কার্যকর থাকা নীতিমালার ভিত্তিতে হিসাব করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জেনেভায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডব্লিউটিওর মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা বলেন, ‘বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের এ সংকোচন বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ডব্লিউটিওর ‘গ্লোবাল ট্রেড আউটলুক রিপোর্ট’ অনুসারে, সংস্থাটি আগের পূর্বাভাসে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু জানুয়ারি থেকে ঘোষিত ব্যাপক শুল্ক আরোপের কারণে তারা পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন করছে। এতে দেখা যাচ্ছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য ‘নাটকীয়ভাবে খারাপ দিকে’ মোড় নিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইস্পাত ও গাড়ির আমদানির ওপর অতিরিক্ত শুল্কের পাশাপাশি বিস্তৃতভাবে বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করেছেন, যদিও পরবর্তী সময়ে অনেক দেশের ওপর আরোপ করা উচ্চ শুল্ক সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছেন। তবে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি শুল্কে একে অন্যের পণ্যের ওপর আরোপিত কর শতভাগ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে কিছু চীনা পণ্যে শুল্ক চড়েছে ২৪৫ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে চীন-মার্কিন বাণিজ্য পুরোপুরি বিচ্ছিন্নতার দিকে যেতে পারে, এতে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মেরুকরণ আরো রক্ষণশীল অবস্থান নিতে পারে। স্বল্পোন্নত দেশগুলো ক্ষতির শিকার হতে পারে সবচেয়ে বেশি।
ডব্লিউটিওর পূর্বাভাস অনুসারে, বর্তমানে স্থগিত থাকা শুল্ক যদি ট্রাম্প পুনরায় চালু করেন, তবে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি দশমিক ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট কমতে পারে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন বাণিজ্যে ছড়িয়ে পড়ার প্রভাবের কারণে আরো দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট হ্রাস ঘটতে পারে। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যে মোট ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর শুল্কের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ওকোনজো-ইওয়েলা। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জিডিপি প্রত্যাশার তুলনায় কম প্রবৃদ্ধি দেখবে। তিনি বলেন, ‘যদি বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য সংকুচিত হয়, তবে এর প্রভাব সমগ্র জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা দেখেছি যে বাণিজ্য সম্পর্কিত উদ্বেগ আর্থিক বাজার ও অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’
এ বিষয়ে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) বলছে, চলতি বছরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। কারণ বাণিজ্য উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার কারণে বৈশ্বিক মন্দার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।
ডব্লিউটিও প্রধানের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো পাল্টাপাল্টি শুল্কের মাঝে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, এ দুই দেশের মধ্যকার পণ্য বাণিজ্য ৮১ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। স্মার্ট ফোন বা ইলেকট্রনিকসের মতো কিছু পণ্যে সম্প্রতি ছাড় না দিলেও চীন-মার্কিন বাণিজ্য হ্রাস ৯১ শতাংশে পৌঁছে যেত।
এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা বলেন, ‘এ বিচ্ছিন্নতা আরো বৃহত্তর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিভাজন তৈরি করতে পারে, যেখানে ভূরাজনীতির ভিত্তিতে দুটি আলাদা ব্লক তৈরি হবে। এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।’
ডব্লিউটিওর পূর্বাভাস অনুসারে, চলতি বছর সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য সংকোচন ঘটবে উত্তর আমেরিকায়, যেখানে রফতানি কমতে পারে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়া আমদানি কমবে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে এশিয়া ও ইউরোপের রফতানি ও আমদানি যথাক্রমে ১ ও ১ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়তে পারে।
আগে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি চীন থেকে পণ্য আমদানি করত। এখন যদি শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞার কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশ থেকে ওই পণ্য কিনতে পারে। আবার চীনও রফতানির জন্য বিকল্প বাজার খুঁজবে। চীন যদি এখন আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া বা লাতিন আমেরিকার মতো তৃতীয় পক্ষের কাছে পণ্য রফতানি শুরু করে। তবে সেসব দেশের স্থানীয় উৎপাদকরা বড় ধরনের প্রতিযোগিতায় মুখে পড়ে যাবে। উত্তর আমেরিকা বাদে অন্য অঞ্চলে চীনা পণ্যের রফতানি ৪-৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ডব্লিউটিও।
আরো বলা হচ্ছে, চীনা টেক্সটাইল, পোশাক ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির আমদানি যুক্তরাষ্ট্রে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এতে বিকল্প সরবরাহকারীদের জন্য নতুন রফতানির সুযোগ তৈরি হবে। এর সুবিধা নিতে পারে কিছু স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি)।
এ বিষয়ে আঙ্কটাড এক প্রতিবেদনে বলছে, উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো ঝুঁকির মুখে এবং বৈদেশিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। তবে দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।